স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব লেখ । স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা আলোচনা কর



স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব লেখ । স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা আলোচনা কর
স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব লেখ । স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা আলোচনা কর

স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব লেখ । স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা আলোচনা কর

  • অথবা, স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা কর ।
  • অথবা, স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা লেখ।

উত্তর : ভূমিকা : আধুনিক রাষ্ট্রে শাসনকার্য পরিচালনায় স্থানীয় সরকার একটি বিশেষ সংগঠন। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা রাজনীতি ও প্রশাসনের একটি উপব্যবস্থা মাত্র। 

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এদেশের শাসন ইতিহাসে অত্যন্ত সুপ্রাচীন একটি প্রতিষ্ঠান। কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়ক ভূমিকা পালন করে স্থানীয় সরকার। 

স্থানীয় সরকার হলো সরকার ব্যবস্থার তৃণমূল পর্যায়। এ প্রশাসন জনগণের সার্বিক কল্যাণে নিয়োজিত। জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রে স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম ।

● স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা : নিম্নে স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করা হলো : 

১. দেশপ্রেম জাগ্রতকরণ : যেকোনো জাতির উত্থানে দেশপ্রেম অপরিহার্য শর্ত। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাতে জনগ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে এলাকায় বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশপ্রেম উদ্বুদ্ধ হয়। 

এ মানসিকতা তাদের মধ্যে জাতীয় সরকারের প্রতি দায়িত্ব পালনের ইচ্ছা জাগাতে পারে। স্থানীয় জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও স্বেচ্ছাদানেই দেশের উন্নতি সম্ভব। 

২. যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা : সরকারের সঠিক পরিচালনা নির্ভর করে যোগ্য নেতৃত্বের ওপর। স্থানীয় শাসনব্যবস্থার ফলে যোগ্য নেতৃত্বের জন্ম হয় । পরবর্তীতে এ নেতার সফল নেতৃত্ব জাতীয় পর্যায়ে রাষ্ট্রকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সক্ষম হয়।

৩. নাগরিকের বাকস্বাধীনতা : স্থানীয় সরকারের মাধ্যমেই নাগরিকগণ তাদের মতামত পরিপূর্ণরূপে ব্যক্ত করতে পারে। স্থানীয় এলাকার নাগরিকগণ স্থানীয় প্রশাসনের কাজে সরাসরি সহযোগিতা করতে পারে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক W. A. Robson, "It is from of civic self-expression par excellence."

৪. সিদ্ধান্ত গ্রহণ : স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়। যেকোনো প্রকল্প গ্রহণ করার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ স্বাধীনতা স্থানীয় সরকারের রয়েছে। সীমিত পরিসরের সকল সমস্যা সমাধানে স্থানীয় সরকার সুষ্ঠু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে সক্ষম।

৫. দায়িত্বশীল নাগরিক গঠন : স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে জনগণ দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ইত্যাদি বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে থাকে এবং প্রত্যেকে প্রকৃত দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পায় ।

৬. গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ : স্থানীয় সরকার সাধারণত জনগণের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। স্থানীয় সরকার কোনো দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ টিকে রাখার ভিত্তিমূল হিসেবে কাজ করে। স্থানীয় এলাকার জনগণের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সৃষ্টির ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত সক্রিয়।

৭. জাতীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ : স্থানীয় সরকারের মাধ্যমেই জনগণ জাতীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের যে বাস্তবভিত্তিক ও অভিজ্ঞতালন্দ শিক্ষালাভ করেন তা আতীয় সরকারের সফলতার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়। স্থানীয় সরকার সু নেতৃত্বের জন্ম দেয় ।

৮. তথ্যসেবা : স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায়ে ই-সেবা চালু হয়েছে। সাধারণ জনগণ ঘরে বসে যাবতীয় ফরম, তথ্য ও সকল ধরনের ইন্টারনেট সুবিধা পেয়ে থাকে।

৯. স্থানীয় উন্নয়ন : স্থানীয় জনগণের উন্নয়ন ও চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার বিশেষ ভূমিকা পালন করে। স্থানীয় শাসকগণ স্থানীয় পর্যায়ে চাহিদা অনুযায়ী অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়। স্থানীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার ব্যাপারে স্থানীয় শাসন খুব উপযোগী।

১০. নাগরিক চেতনার বিকাশ : নাগরিকের চেতনা বিকাশে স্থানীয় সরকারের প্রয়োজনীয়তা অনেক। স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে যুবসমাজের মধ্যে নাগরিক চেতনার বিকাশ ঘটে। যার ফলে দেশের উন্নয়ন ও অন্যান্য কর্মসূচিতে যথার্থভাবে অংশগ্রহণ করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধান করা সম্ভব হয় ।

১১. নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ : স্থানীয় সরকারের উদ্দেশ্য শুধু সেবাদান করা নয়; স্থানীয় পর্যায়ের জন্য গৃহীত সরকারি কর্মকাণ্ডে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে অবাধ সুযোগ সৃষ্টি হয়। নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণ পুরুষের পাশাপাশি নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে। পুরুষ নেতৃত্বের পাশাপাশি নারী নেতৃত্ব সৃষ্টি হয় ।

১২. সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধ : স্থানীয় সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে। স্থানীয় সরকারের মাধ্যমেই জনগণের স্বাধীনতা যথাযথভাবে মূর্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয় সরকার নীতি বাস্তবায়ন করে। স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে জাতীয় প্রশাসন স্থানীয় জনগণের ওপর আস্থা স্থাপন করতে পারে।

১৩. প্রশাসন প্রতিষ্ঠা : স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় স্থানীয় অধিবাসীরা তাদের এলাকার সমস্যা সম্পর্কে বেশি অবগত থাকে। স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণ তাদের স্থানীয় বিষয়াদি পরিচালনা করতে পারে। এতে করে তারা স্বশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

১৪. পুনর্বাসনমূলক কাজ : দুর্যোগকালীন এবং দুর্যোগপরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকার দুর্যোগকবলিত এলাকার মানুষকে পুনর্বাসনে সহায়তা করে । পুনর্বাসনকার্য বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব অপরিসীম।

১৫. দুর্যোগ মোকাবিলা : বাংলাদেশকে প্রায়শই সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হতে হয়। স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে সরকার দ্রুত দুর্যোগ মোকাবিলায় ত্বরিত ভূমিকা পালন করে।

১৬. জাতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন : স্থানীয় সরকার জাতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যাপক সহযোগিতা করে। তৃণমূল পর্যায়ে পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়ন স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে সম্ভব হয়। জাতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার উপবিধি প্রণয়ন করেও কাজের গতিশীলতা প্রদান করে।

১৭. স্বৈরতন্ত্র প্রতিরোধ : স্থানীয় সরকার স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রবল বাধা হিসেবে কাজ করে থাকে। কেন্দ্রীয় সরকার খুব বেশি প্রভাবশালী হলে একনায়কতন্ত্রের পথ সুগম হয়। এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণকে সোচ্চার করে ।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রকৃত অর্থে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই। 

প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনসাধারণের জীবনযাত্রায় কেন্দ্রীয় সরকারের তুলনায় স্থানীয় সরকারের প্রভাব সর্বাধিক। 

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে যৌক্তিকভাবে শক্তিশালীকরণের মাধ্যমেই স্থানীয় জনগণকে সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করে। তাই বলা যায়, গণতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে স্থানীয় সরকারের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম । 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url